কিছু একটা (দেখক)

গলির মোড়ে মতি মিয়ার সিডির দোকানের সাইনবোর্ডটা বদলে ফেলা হয়েছে। 'ঝুমা ভিডিও' লেখা মরচে পরা স্টীলের পাতের সাইনবোর্ডের জায়গায় এখন 'ভিশন কম্পিউটার' এর ঝকঝকে ডিজিটাল সাইনবোর্ড। ঝুমা মতি মিয়ার বড় মেয়ে - বাপের বাড়ি ছেড়েছে বহুদিন আগে। দুই ছেলের মা এখন। ঝুমার বিয়ের পরেই মতি মিয়ার সিডির ব্যবসা ডাউন খাওয়া শুরু করে। ত্রিশ টাকার ছবির সিডি কিনে কেও তখন ছবি দেখত না। এক ছবি একবার দেখলেই তো শেষ। তারচেয়ে মতি মিয়ার দোকান থেকে দশ টাকায় সিডি ভাড়া নিয়ে দেখলেই হয়ে গেল! বেশ চলছিল 'ঝুমা ভিডিও'র ব্যবসা। এলাকার কমিশনারও পান চিবুতে চিবুতে এসে বলত 'একখান ভাল দেখে সিডি দেও দেখি মিয়া - ঘরের লোক নিয়া দেখন যায় এইরাম একখান সামাজিক ছবি দিও। বোঝই তো যা দিনকাল চলছে! ঘরের লোকজন নিয়া শান্তিমত একখান ছবি দেখুম তাও হয়না - যত্তসব অশ্লীল নাচ গান আর ছোট পোশাকের ছড়াছড়ি! দেশটা যে কই যাচ্ছে না...'
সেই জমজমাট সিডির ব্যবসায় হালকা চাপ পড়ল ঐ কমিশনারের ছোট ভাইয়ের ডিশ আনার পর। লোকজন মাসিক একশ' টাকা বিলে ডিশের লাইন নেয়া শুরু করল। সিডি চ্যানেলে প্রতিদিন দুইটা করে নতুন ছবি দেখায় কিনা! সাথে হিন্দী চ্যানেলে সপ্তাহে তিন-চারদিন তো ছবি হয়ই! দুম করে মতি মিয়ার বেশ কিছু কাস্টমার কমে গেল। ভিসিআর ভাড়া দিয়ে আর পাইরেটেড ছবির বদৌলতে তারপরও ভালই চলছিল ব্যবসা। তারপর আসল ডিভিডি! এক সিডিতে ছয়টা ছবি। তখনও কম্পিউটারের চল হয়নি ততটা। পুরা পাড়ায় দুই কি এক ঘরে কম্পিউটার ছিল - তাও অন্যান্য কাজের জন্য। কম্পিউটারে কেও ছবি দেখত না তেমন। ডিভিডিতেই ছবি দেখত সবাই। মতি মিয়ার ব্যবসাও চলছিল ভালই - ডিশের ফারা কেটে গেছে ততদিনে। কারণ ডিশে হয় খবর চলে নয়ত সিরিয়াল। ছবি তো আর চলেনা। ঝুমার বিয়ের পরই যেন মতির উপর শনির নজর পড়ল। বেশ কয়েক ঘরে কম্পিউটার তখন। কেও আর সিডিতে ছবি দেখেনা কম্পিউটারেই দেখে। তাও আবার এক সিডি একজন নিলেই সেটার কপি সবাই পেয়ে যায়। মতি মিয়া দোকানের ভার ছেড়ে দিল ছেলে রুবেলের হাতে। চায়না মাল্টিমিডিয়া মোবাইলের তখন সেই চল। উঠতি বয়সি সবার হাতেই মোবাইল। রুবেল একটা সেকেন্ড হ্যান্ড কম্পিউটার কিনে মোবাইলে গান লোড দেওয়া শুরু করল। 'ঝুমা ভিডিও' হয়ে গেল লোডের দোকান। কেও সাইনবোর্ডের দিকে তাকায়ও না। রুবেলের ব্যবসা ভালই - হাফ গিগা ২০, এক গিগা ৩০ টাকা ; জমজমাট ব্যবসা। সেই ব্যবসায়ও কমে গেল যখন কম্পিউটার ওয়ালাদের হাতে কার্ড রিডার জিনিসটা এলো! নিজেরাই নিজেদের মোবাইলের পাশাপাশি বন্ধুদের মোবাইলেও ফ্রি লোড দেয়ার দায়িত্ব তখন তাদের হাতে! আস্তে আস্তে সেই চল কমে এল। অনেকের বাসায়ই এখন কম্পিউটার আছে। সবাই ভাল প্রিন্টের মুভি দেখে - কম্পিউটারে। সেই মুভি নেট থেকে নামাতে হয়। খরুচে ব্যাপার। রুবেল এবার শুরু করল পেন ড্রাইভে এইচডি প্রিন্ট মুভি লোড দেওয়া - হলিউড,বলিউড,ঢালিউড! সাথে ফটোকপি আর প্রিন্টের ব্যবসা তো আছেই! 'ঝুমা ভিডিও' নাম আর চলে না তাই 'ভিশন কম্পিউটার' লাগানো!
ভাবছি সবার ঘরে প্রিন্টার আর ব্রডব্যান্ড কানেকশনটা পৌছে গেলে রুবেল পরে নতুন কি করবে! কিছু একটা তো করবেই - বেঁচে থাকার তাগিদে হলেও কিছু তো করতেই হবে। কিন্তু সেই 'কিছু' টা কি সেটাই ভাবছি..

(কুষ্টিয়া থেকে ফেরার পথে, বাসে বসে লেখা)
৩ মার্চ ২০১৫
ফেসবুক হতে

Comments