Posts

যন্ত্রমানব

স্পষ্ট মনে আছে - সেলুনে চুল কাটাতে নিয়ে যেত বাবা। বাসায় নরসুন্দর এনে চুল কাটানো যেত, কিন্তু তাতে আমার বেজায় আপত্তি ছিল। চিল্লাচিল্লি করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলতাম এক চুল না কাটানোর জন্য। পরে অবশ্য 'বিকশো'র স্টিকার কিনে দিতে চাইলে অনেকটা অনন্যোপায় ভঙ্গিতেই সেলুনে গিয়ে চুল কাটাতে রাজি হতাম। ছোট মানুষ। সেলুনের চেয়ারে বসলে আয়নায় নিজেকে দেখা যায়না - চুল কাটতেও সমস্যা। তখন চেয়ারের দুই হাতলের উপর কাঠের তক্তা দিয়ে উচ্চতা বিষয়ক সমস্যার সমাধান করা হত আরকি! তারপর সেই তক্তার উপর বসে কিছুক্ষণ চেয়ার ঘোরাতাম। একসময় চুল কাটা শুরু হত। একটু পর আবার চিল্লাচিল্লি করে চুল কাটানো অফ । ১০ মিনিটের চকলেট বিরতিতে ননি দা হয়ত অন্য একজনের শেভ করতেন। মাঝে মাঝে এই গ্যাপে বাবাই চুল কাটাতেন। ননি দার পুরো নাম ননি গোপাল দাস। তার কাছেই নিয়মিত চুল কাটাতাম। অদ্ভুত ব্যাপার হল তিনি আমার বাবারও দাদা - আমারও দাদা। তো ননিদা বেশ বিরক্ত হত আমার চিল্লাচিল্লিতে। তবে এই বিরক্তির মধ্যেও একটা প্রশ্রয় ছিল। চুল কাটা শেষে ক্ষুর দিয়ে বর্ডার দেয়ার পার্টটাই ছিল সবচে' কঠিন। পানি দিয়ে ভিজিয়ে ক্ষুর টানলে গা শিউরে উঠত। আবার চিল্লাচিল্ল...

প্রতিধ্বনি

আমি শুকিয়ে যাব খরখরে তপ্ত রোদে যেমন সবুজ কচি পাতাগুলো কুকড়ে যায় আর হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় ঝড়ে পরে ঠিক তেমনি অকালেই হয়তো ঝরে যাব একদিন! তখন সব নোনা স্মৃতিতে আমাকে স্মরতে এসো না কক্ষনো না - চুপসানো বেলুনের মত কুড়ে খাওয়া স্মৃতিতে আমার অস্পষ্ট মুখ চোখে ভাসবে, খবরদার আমায় ডেকনা নামধরে। ঘুনে ধরা কাঠের মত যখন সর্বগ্রাসী বিষাদ আমার সবটুকু গ্রাস করছিল ভাইরাসের মত তখন কেরোসিন হয়ে এগিয়ে আসনি বলে আমার চিতার আগুনে ঘি ঢালার অধিকারও হারিয়েছ! পরজন্মে হয়তো ফিরে আসব হতে পারে যীশুর মতো প্রত্যাবর্তন অবিশ্বাসী চোখের চাহনী দেখতে চাইনা আর বিশ্বাসের গ্রিডে ধ্বস নামলেও অবিশ্বাসের ছায়া মাড়িওনা অবেলায় ঝড়ে যাওয়ার আগেই মিনতি করছি শোন - কান পাতলেই শুনতে পাবে ধুসর পাতার মর্মর ধ্বনি!

হেডফোন

সবাই বলে মানুষ চেনা যায় জুতায়। আসলে মানুষ চেনা যায় হেডফোনে। এই যেমন প্যাঁচ খাওয়া হেডফোন সবসময় কানে গোঁজা থাকলে বুঝতে হবে ছেলেটা বা মেয়েটা আসলে বিষণ্ণতায় ভুগছে। আবার নিঃসঙ্গতায় ভোগা মানুষদের হেডফোন হয় এখানে-ওখানে টেপ লাগানো, অনেকটা ঝিমিয়ে যাওয়া মতন। এরা সবকিছুর মায়া ছাড়তে পারে কিন্তু হেডফোনের মায়া এরা কোনভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারেনা ; পুরোনো হেডফোনটাই টেপ-টুপ লাগিয়ে চালিয়ে নেয়। সাথে জোড় করে আঁকড়ে ধরা পুরোনো কিছু স্মৃতি। নতুন চকচকে হেডফোনওয়ালারা হয় বিলাসী। এরা হেডফোনে গান শোনে কিছুটা অবসর কাটানোর জন্য, বাকিটা শখের বশে। সে কথা থাক। হেডফোনের অভাববোধ প্রবলভাবে মাথা চারা দিয়েছে দুদিন হল। শেষ হেডফোনটা পরশু বাস থেকে নামতে গিয়ে টান লেগে ছিঁড়ে গিয়েছে। আগে থেকেই ওটার অবস্থা অবশ্য বেশ খারাপ ছিল - শরীরভরা কালো-সাদা টেপের ব্যান্ডেজ। হেডফোনটা কিনে দিয়েছিল অদ্রি - নীলক্ষেত থেকে। গত ফাল্গুনে দুজনে হাটছিলাম শহীদ মিনারের সামনে দিয়ে। আমার এক কানে হেডফোনে চলছে ডিফারেন্ট টাচের 'শ্রাবণের মেঘগুলো '। অদ্রি কি যেন বলছিল। অন্যমনস্ক ছিলাম বলে শুনতে পাইনি। হঠাৎ আমার সামনে দাড়িয়ে একটানে হেডফোনটা খুলে ফেলল। আমি ...

অপ্রকাশিত

মাঝরাতে সত্যমিথ্যার মিশেল, আস্তে আস্তে মিথ্যার বিচ্যুতি- আর শেষরাতে নিরেট সত্যকাহনে জীবনের গল্পগুলো অক্ষরে রূপ পায় নীলক্ষেতে কেনা প্যাডের শুভ্র পাতায় কালো কালির হিজিবিজি দাগে। ছেলেটা লিখেই চলে ভোর অব্দি, তারপর রক্তবর্ণ ঢুলুঢুলু চোখে পড়তে থাকে, আস্তে আস্তে পান্ডুলিপিটা ভরে যায় ঘিজিমিজি দাগে, দুমড়ানো-মুচড়ানো পেজগুলোর শেষ ঠিকানা সেই ময়লার ঝুড়ি। গল্পগুলো অপ্রকাশিতই থেকে যায়; কিছু গল্প বলি বলি করেও বলা হয়না বাকিগুলো সবার কাছে বলা যায়না...

শুধুই জবাবদিহিতা

এই যে হাজারো মুহূর্ত ইন্দ্রিয়ের অপব্যবহারে অবহেলায় কাটিয়ে দিচ্ছি কখনও জিজ্ঞেস করেছ - কেন? কেন ঘন্টার পর ঘন্টা কানে হেডফোন গুঁজে কখনও একমনে কখনওবা আনমনে সুরের মাঝে হারিয়ে গেছি? প্রতিটা স্পন্দন আমি অনুভব করতে চেয়েছি। কেনইবা হাজারো মানুষের ভীড়ে এর-ওর মুখপানে তাকিয়ে বিব্রত করেছি শতজনকে, খুঁজেছি লুকানো অনুভূতিগুলোকে। টং দোকানের জমাট আড্ডায় বকবক করেছি যুক্তি-অযুক্তির সমাবর্তনে মুখে ফেনা তুলেছি সে শুধুই নিজেকে ব্যাখ্যা করার ব্যর্থ প্রয়াসে। আত্মপক্ষ সমর্থনে নয় - স্বতঃস্ফূর্ত এ কথাগুলো শুধুই জবাবদিহিতা মস্তিষ্কের কাছে হৃদয়ের, হৃদয়ের কাছে মস্তিষ্কের... [উৎসর্গ : 'হলেও হতে পারত' এক বন্ধুকে। তখন বলেছিলাম, এখন আর বলছিনা :D ]